ফুটবল
মেসি রোনাল্ডোর পরে লামিনে ইয়ামাল কি নতুন ফুটবল হিরো
মেসি রোনাল্ডোর পরে লামিনে ইয়ামাল কি নতুন ফুটবল হিরো
মেসি রোনাল্ডোর পরে লামিনে ইয়ামাল কি নতুন ফুটবল হিরো জার্মানির বার্লিন শহরের অলিম্পিয়াস্তাদিও স্টেডিয়ামে, ভারতীয় সময় রাত সাড়ে বারোটায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ইউরো ২০২৪ ফাইনাল। ইউরো ২০২৪ জেতার জন্য নব্বই মিনিটের সংগ্রামে সামিল হতে চলেছে, আলভারো মোরাতার স্পেন এবং হ্যারি কেনের ইংল্যাণ্ড। প্রবল ফুটবল জ্বরে কাঁপছে সারা বিশ্ব। সম্ভাবনা কিন্তু আছে যে হতে পারে আজ ইউরো ফাইনালে উঠে এলেন এক নতুন তারকা। কে হতে পারেন সেই নতুন ফুটবল তারকা? তবে কি মেসি রোনাল্ডোর পরে লামিনে ইয়ামাল সেই নতুন ফুটবল হিরো।
লুই দে লা ফুয়েন্তের দল কিন্তু ইউরো শুরু থেকে কিছ দূর এগিয়ে, ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। ইউরো শুরুর আগে, কেউ আশা করেনি, স্প্যানিশ দল পুরো প্রতিযোগিতায় এমন ছন্দবদ্ধ এবং অপ্রতিরোধ্য খেলবে। আসলে ফুয়েন্তে এমন একটা কাজ করেছেন, যেটা আর কোন দলের কোচ করতে পারেননি। সেটা হল, দলটাকে এক সুতোয় বাঁধা। প্রত্যেক খেলোয়াড় যেন একে অপরের পরিপূরক। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের কথা আলাদা করে বলার দরকার নেই। দলগত সংহতি সত্যি দেখার মত।
ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে ইউরো ২০২৪
প্রতিপক্ষ ইংল্যাণ্ডের কাছে ইউরো ফাইনাল জেতা যে সহজ হবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। সেটা ইংল্যাণ্ড দলের কোচ, গ্যারেথ সাউথগেট খুব ভালো জানেন। ১৯৬৬ সালের পর, ইংলিশ ফুটবল দল কোন বড় প্রতিযোগিতা জিততে পারেনি। না বিশ্ব কাপ, না ইউরো। এদিক থেকে দেখলে, এবার ইউরো জিতলে, সাউথগেট অবধারিত ইতিহাসে নাম লিখিয়ে ফেলতে পারবেন। কে বলতে পারে, নাইট উপাধিও পেয়ে যেতে পারেন।
ইউরো ফাইনাল এবং ইতিহাস
এদিকে আবার এবার ইউরো ফাইনালের সঙ্গে ইতিহাসও জুড়ে গেছে। যদিও সেটা অন্য এক দিক থেকে। এবার যে অলিম্পিয়াস্তাদিও স্টেডিয়ামে ইউরো ফাইনাল অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তার সঙ্গে ইতিহাসের সরাসরি যোগসূত্র আছে। ১৯৩৬ সালে হিটলারের নির্দেশে, এই স্টেডিয়ামের জন্ম, অলিম্পিক কেন্দ্র করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, হিটলার সৃষ্ট বহু সৌধ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই ধ্বংস লীলা অতিক্রম করে বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে অলিম্পিয়াস্তাদিও স্টেডিয়াম।
স্বামী বিবেকানন্দকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি এত লঙ্কা খান কেন?
হিটলার ছিলের তীব্র কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষী। ভাগ্যের কি পরিহাস! হিটলারে পছন্দের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১৯৩৬ অলিম্পিকে সব থেকে সফল ছিলের আমেরিকার জেরি ওয়েন্স। চার-চারটে সোনা জিতেও ওয়েন্স কিন্তু হিটলারের মনে দাগ কাটতে পারেননি। উল্টে, ওয়েন্স কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে, হিটলার বিরক্তি উগরে দিয়েছিলেন।
কি অদ্ভুত! এবার, ইউরো ২০২৪ কিন্তু একের পর এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের ক্রীড়া শৈলিতে দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। লামিনে ইয়ামালকে দিয়ে শুরু করা যাক। বাবা মরক্কোর। মা ইকোটোরিয়াল গায়নার. যার ধমনীতে আর্য রক্ত নয়, বইছে কৃষ্ণাঙ্গ রক্ত।
মাত্র বছর দশেক আগের কথা। ইয়ামালের বয়স তখন মাত্র সাত। দেড় ঘন্টার পথ অতিক্রম করে, বার্সেলোনায় অনুশীলনে পৌঁছে দেওয়ার আগে, স্থানীয় এক ছোট্ট বারে ছেলেকে প্রাতঃরাশ করাতে নিয়ে আসতেন, বাবা কার্লোস সেরানো। সেই ইয়ামালের নিখুঁত ফুটবল পাসে, বিপক্ষ দল টলোমলো। বলতে গেলে, প্রায় একক দক্ষতায়, সেমি-ফাইনালে, কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্সকে, হারিয়ে স্প্যানিশ দলকে ইউরো ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে ইয়ামাল।
ক’দিন আগেও রোকাফোণ্ডার ফুটপাথ দিয়ে বল পায়ে জাগলিং করতে করতে মাঠের দিকে যেত ছেলেটা। মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৭ তম জন্মদিন গেছে ছেলেটার। আজ সেই ছেলের পায়ের জাদু দেথতে টেলিভিশনের পর্দার দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকবে সারা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক। কে বলতে পারে, রবিবার পার করে সোমবারের শুরুতে, হয়ত লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পরে উঠে এলেন এক নতুন ফুটবল তারকা, যে উত্থানের সাক্ষী হয়ে থাকব আমরা সবাই। তবে কি শুরুতে যে আলোচনা হয়েছে, সেটাই সত্যি হবে। মেসি রোনাল্ডোর পরে লামিনে ইয়ামাল কি নতুন ফুটবল হিরো?

চর্চা
ফুটবল নিয়ে সিনেমা খেলাকে ছাপিয়ে আসলে স্বাধীনতার জন্য লড়াই
প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটা আস্ত সিনেমা ফুটবল নিয়ে। আসলে কিন্তু ছবিটা নিছক ফুটবল নিয়ে নয়। ফুটবল নিয়ে সিনেমা খেলাকে ছাপিয়ে আসলে স্বাধীনতার জন্য লড়াই। যে লড়াইয়ের মধ্যে মিশে আছে বাঙালির নব জাগরণ। বাঙালির আবেগ। আছে তার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। এ ছবি ইতিহাসকে পুনরায় জাগ্রত করার ছবি। ছবির নাম গোলন্দাজ। গোরা সাহেবরা বাঙালিকে তাচ্ছিল্য করত। মানুষ বলে মনে করত না। ফুটবল ঘিরে এ ছবি, সেই তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ছবি।
ছবির পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। প্রযোজনায় এসভিএফ। হলফ করে বলা যায়, বাংলায় এর আগে খেলা নিয়ে এমন নিটোল ছবি আগে কোন দিন হয়নি। উনিশ শতকের কলকাতা উঠে এসেছে পরতে পরতে।
গোলন্দাজ ছবির গল্প কি নিয়ে
শিক্ষিত এবং রুচিশীল সর্বাধিকারী পরিবারের ছেলে নগেন্দ্রপ্রসাদ। প্রতিবাদ এই পরিবারের রক্তে। মায়ের সঙ্গে গঙ্গা স্নানে যাওয়ার পথে চোখে পড়ে, সাহেবরা ফুটবল খেলছে। প্রথম দর্শনে ফুটবল ভালো লেগে যায়। বড় হয় নগেন্দ্রপ্রসাদ। চোখে পড়ে বাঙালিদের প্রতি ইংরেজদের তীব্র ঘৃণা। তারা মনে করে ফুটবল তাদের খেলা। বাঙালির অধিকার নেই ফুটবল খেলার। সাহেবদের কাছে পিঠে দেখলে, দুর্বল বাঙালি পিঠটান দেয়। যত দিন যায়, নগেন্দ্রপ্রসাদ আরও বেশি করে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেন। খুব ইচ্ছে একটা দল গড়ে, অহংকারী ইংরেজকে তাদেরই খেলায় হারিয়ে দেবেন। লেগে পড়েন দল গড়তে। তাঁর এই প্রবল ইচ্ছে তাঁকে ক্রমশ ইংরেজদের চক্ষুশূল করে তোলে। কিন্তু নগেন্দ্রপ্রসাদ যে কিংবদন্তী। তাঁর হাতে যে নতুন ইতিহাস গড়ার সব কিছু রসদ মজুদ।
পড়ুন : প্রধান বনাম প্রধান লড়াইয়ে জিতল কে দেব কি পারলেন
নগেন্দ্রপ্রসাদ সম্পর্কে বাঙালি কখনই খুব বেশি জানত না। তাঁর সাহসিকতা, তাঁর বিপ্লব, তাঁর নেতৃত্ব সব কিছু, সেই সময়ের তুলনায় ছিল অনেক এগিয়ে। ফুটবলের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং ত্যাগ কখনই প্রচারের আলো পায়নি। বাঙালি যদি তাঁর নাম না জানে, সেটা যেমন দুর্ভাগ্যের, তেমনই লজ্জার। নগেন্দ্রপ্রসাদ এক প্রকার বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের জনক। তিনিই বুঝেছিলেন, ভালো ফুটবল খেলতে চাই সঠিক পরিকাঠামো। দরকার নিয়মিত অনুশীলন। একটা সংগঠিত দলেরও খুব দরকার।
ইতিহাস গড়েছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী
ওয়েলিংটন ক্লাবের জন্ম নগেন্দ্রর হাতে। তাঁবু পড়েছিল একেবারে ইংরেজদের তাঁবুর পাশে। ক্লাব পরিচালন সমিতিতে মতানৈক্যের কারণে, নগেন্দ্র ওয়েলিংটন ক্লাব ছেড়ে দেন। বিবাহ হয়ে যায়। শ্বশুরের সহযোগিতায় ১৮৮৭ সালে নব জাগরিত হয় শোভাবাজার ক্লাব। শুরুর দিকে শুধু হার। কিন্তু নগেন্দ্র হার মানার পাত্র ছিলেন না। ১৮৯২ সালে একটি প্রতিযোগিতার ফাইনালে, শক্তিশালী ইংরেজ ক্লাবকে হারিয়ে দেয় শোভাবাজার। বাঙালি অনুভব করে, লেগে থাকলে তারাও জিততে পারে। ১৯১১ সালের আগে মোহনবাগানের আই এফ এ শিল্ড জয়ের প্রায় কুড়ি বছর আগে এই ছিল কোন বাঙালি ক্লাবের দারুণ এক সাফল্য।
আরও পড়ুন : ‘বিজয়া’তে স্বস্তিকা নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে গিয়েছেন
বাঙালির ফুটবল ইতিহাসকে ঘটনার পরম্পরায় ‘গোলন্দাজ’ ছবিতে দারুণ ভাবে মিশিয়েছেন পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। সারা ছবি জুড়ে দর্শক দেখে সময়ের এক দীর্ঘ সফর। ছবির মধ্যে বিশেষ মুহূর্তে নগেন্দ্রর ভূমিকায় দেব গর্জে ওঠেন “মরে যাব, কিন্তু হেরে ফিরব না”। ইংরেজদের সঙ্গে খেলা মানে আকাশকুসুম স্বপ্ন। তাদের মাঠে বাঙালিকে খেলতে দেখলে, চাবুক খেতে হত। সেখানে নগেন্দ্র, সবুজ ঘাসে ফুটবলে খেলে জয় এনে দিয়েছেন। এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
‘গোলন্দাজ’ ছবির এক বড় আকর্ষণ বিক্রম ঘোষের সঙ্গীত। তাঁর তালবাদ্যের প্রয়োগ ও আবহ ছবির দৃশ্যগুলিকে সমৃদ্ধ করে। কাজে দারুণ মুন্সিয়ানা। ইতিহাস-নির্ভর ছবির গল্প এবং চিত্রনাট্যর পাশে কী ভাবে সমান্তরালে সঙ্গত করে যেতে হয়, সেই মুন্সিয়ানা দেখিয়ে দিয়েছেন বিক্রম। ছবির গীতিকার শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুগত গুহ। ছবিতে ক্যামেরার কাজও অনবদ্য। চরম নাটকীয় মূহূর্ত থেকে চরিত্রদের আবেগ আলাদা ভাষা পায় আলো-আঁধারির খেলায়। আলোর ব্যবহারে ছবি জুড়ে যেন কবিতা বুনেছেন চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার।
বাকি কে কেমন অভিনয় করলেন
ছবির একটি বড় চমক নগেন্দ্রর বাবা সূর্যকুমার সর্বাধিকারীর চরিত্র। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন গায়ক শ্রীকান্ত আচার্য। নগেন্দ্রর চরিত্রে দেব কেমন অভিনয় করেছেন তা নিয়ে কোন কথা হবে না। ছবি না দেখলে, সেই অভিনয়ের বিশ্লেষণ ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। এ অভিনয় সম্ভবত তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা। এই চরিত্রে দেব যেভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, তা ছবি না দেখলে বিশ্বাস হবে না। নগেন্দ্রর স্ত্রী কমলিনীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ইশা সাহা। ছক ভাঙা চরিত্র। ইশা চরিত্রের প্রতি যথাযথ সুবিচার করেছেন। রাজা আনন্দকৃষ্ণর ভূমিকায় অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল অভিনয় করেছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।
ভার্গব নামে এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরিত্র বিশেষ ভাবে দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়। অভিনয় করেছেন অনির্বাণ ভট্টচার্য। পুলিশকে ফাঁকি দিতে হরেক রকম ছদ্মবেশ ধারণ থেকে শুরু করে স্বল্প পরিসরে এই চরিত্রে অনির্বাণের অভিনয় খুব মনে রাখার মত। ছবিতে চরিত্রের সংখ্যা অনেক। প্রসন্নকুমারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরিচালক –অভিনেতা জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। নগেন্দ্র ছিলেন তাঁর ছেলের মত। নগেন্দ্রর মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তুলিকা বসু। ইংরেজদের সুবিধাভোগী এক ঘাতকের চরিত্রে আছেন দেবরঞ্জন নাগ। ভাল কাজ করেছেন উজান চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ শিকদার, বিশ্বজিৎ দাস, অমিতাভ আচার্য।