বিশিষ্ট
কবি নীরেন্দ্রনাথকে বাঙালি কখনও ভুলবে না

জন্ম: ১৯ অক্টোবর ১৯২৪
চন্দ্রগ্রাম, ফরিদপুর, বাংলাদেশ
মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮
জীবন সঙ্গী:
কবি নীরেন্দ্রনাথকে বাঙালি কখনও ভুলতে পারে না। কিন্তু কবিতা লেখার সাথে তিনি এক দক্ষ সম্পাদকও ছিলেন বটে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর হাত ধরে বাজারে আসতে চলেছে ছোটদের পত্রিকা আনন্দমেলা। প্রতিষ্ঠা সম্পাদক নিযুক্ত হলেন, আনন্দবাজার গোষ্ঠীতে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে কর্মরত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। একে তো ছোটদের পত্রিকা তায় আবার নতুন। চূড়ান্ত আকর্ষণীয় করে তোলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদকের। শুরু হল একে একে মতি নন্দী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ দিকপালকে দিয়ে কিশোরদের জন্য লেখানো।
শুধু আনন্দের উপকরণ থাকলে তো হবে না। তার সাথে পত্রিকাটি যদি লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও কাজে আসে, তাহলে তাকে আর পায় কে! চিন্তাভাবনা শুরু হল কি করে ব্যাকরণ বা বানানের মতো ভীতিপ্রদ বিষয়কে কিশোর পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়! সম্পাদকের সজাগ দৃষ্টি পড়ল সেদিকে। শুরু হল, শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকারের মতো লেখকদের দিয়ে এসব বিষয়ে লিখিয়ে নেওয়া। ছড়ার আকারে নিজেও সম্পাদকীয় লিখতে শুরু করলেন।
জন্ম ১৯২৪ সালের ১৯ অক্টোবর, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ১৯৩০ সালে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। একে-একে মিত্র ইনস্টিটিউশন, বঙ্গবাসী এবং সেন্ট পলস কলেজে পড়াশোনার শেষে ১৯৫১ সালে যোগ দেন আনন্দবাজার পত্রিকায়।
নীরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে শীর্ষেন্দু বলেছেন…
আনন্দবাজার পত্রিকায় সবে চাকরিতে ঢুকেছেন এক তরুণ। জনৈক তরুণের ছিল এক চরম দুর্বলতা। কখনও সময়ে লেখা দিতে পারতেন না। তবে তার জন্য সম্পাদকের কাছে থাকত এক মোক্ষম দাওয়াই। সেটা কেউ বিশেষ জানতেন না। সম্পাদক, তরুণকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে টেবিলের উপর রাখতেন এক প্যাকেট সিগারেট আর এক ফ্লাস্ক চা। চোখ পাকিয়ে বলতেন, ‘লেখা না দিয়ে ছাড়া পাবি না।‘ তারপর সত্যি ঘরে তালা লাগিয়ে দিতেন। না কোন বকাঝকা। না কোন বিরক্তি প্রকাশ। স্রেফ তালাবন্ধ রেখে লিখিয়ে নিতেন। এক সাক্ষাতকারে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পর্কে এমনই বলেছিলেন বিশিষ্ট লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
বলেছিলেন, আমার এক রকমের লোকাল গার্জেন ছিলেন। তুইতোকারি করতেন। বিয়ের পর আমার বউকেও ভাসুরঠাকুরসুলভ গাম্ভীর্যে তুই সম্বোধনে ডাকতেন। নীরেনদা আমার কাছে বড় দাদা। অমন জ্ঞানী মানুষের সামনে বসে শব্দ-ছন্দ-বানান-ব্যকরণ কত কি যে শিখেছি! ভাষার উপর এত দখল, দেখে অবাক হতাম। মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে কোনও যুক্তি না মেনে তর্ক করতে চাইছি বুঝলে আশকারা দিতেন। কখনও বিরক্ত হতে তো দেখিইনি, উল্টে আরও জুতসই যুক্তিতে কুপোকাত করেছেন আমাকে কত কত বার! আমার লেখকজীবনে যে প্রশ্রয়, যে আদর ও স্নেহ তাঁর কাছে পেয়েছি, তেমন করে আর কারও থেকে নয়। লিখিয়ে নিতে পারেন ক’জন? নীরেনদা ছিলেন সেই লিখিয়ে নিতে পারা সম্পাদক গোষ্ঠীর অন্যতম মুখ।
আরও পড়ুন: সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের অদ্ভুত জীবন দর্শন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাধু হবেন
‘আনন্দমেলা’-য় ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ লেখার সময় নীরেনদার উৎসাহ, সাহস ও প্রেরণা না পেলে ওই লেখা লিখতে পারতাম কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। নীরেনদা যখনই বাড়িতে এসেছেন, তখনই তাঁর নিজস্ব জ্ঞান ও শিক্ষা দিয়ে ঘরোয়া আড্ডাগুলোকে জমিয়ে দিতেন। খাওয়াদাওয়া করতে করতেও কতই না রসিকতায় মুড়ে দিতেন সব। বস্তুত, খুব স্বল্পবাক মানুষ ছিলেন, কিন্তু মুখের অনুপম হাসিটিই যেন বলে দিত অনেক না বলা কথা।
ভাষাবিদ পবিত্র সরকার ছিলেন নীরেন্দ্রনাথের গুণমুগ্ধ…
কবিতা-ছড়ার পাশাপাশি তিনি অসাধারণ বাংলা গদ্য লিখতেন। সব মানুষের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে কী ভাবে কথা বলতে হয়, সেটাও তিনি শিখিয়ে গিয়েছেন। নির্ভুল এবং নিঁখুত লেখার ভাষা নির্মাণ করতে হলে, অনেক কিছু জানতে হয়। বানান, শব্দের প্রয়োগ ইত্যাদি। কঠিন শব্দকেও কী ভাবে সহজের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায়, যার ফলে শৈলিতে একটা ঢেউ তৈরি হয়, এটা নীরেনদা ছাড়া সত্যি সত্যি আর কেউ পারতেন না। কারণ, ভাষাটাকে তিনি স্রষ্টার জায়গা থেকে তো বটেই ভাষা-ভাবুকের দিক থেকেও সৃষ্টি এবং ব্যবহার করতেন।
বলেছেন ভাষাবিদ পবিত্র সরকার।
বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁর নানা ধরনের চিন্তা ছিল। ছিল ভাষাসংক্রান্ত নানা কাজকর্ম। সেটা আশির দশকের গোড়ার দিক। নীরেনদা তখন আনন্দমেলার সম্পাদক। কিছু দিন আগেই শঙ্খ ঘোষ তাঁর অনুরোধে কুন্তক ছদ্মনামে ‘ভাষার খেলা’ লিখেছেন। আমাকে নীরেনদা বললেন, ছোটদের জন্য লিখতে। বিষয়টাও বলে দিলেন। কী ভাবে বাংলা উচ্চারণ করতে হবে, সেই বিষয়েই প্রকাশিত হল ‘বাংলা বলো’। এই সব লেখা তিনি আমাদের দিয়ে লেখাতেন। তাঁর নির্দেশেও আমরা বাংলা ভাষার নতুন নতুন কাজ করতে পেরেছি।
কবি নীরেন্দ্রনাথ বাংলা আকাদেমির সভাপতি হয়েছিলেন
পরে নীরেনদা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি হয়েছিলেন। তাঁর আমলে বেশ কয়েকটা ভালো অভিধান বেরিয়েছিল। সবগুলোর প্রুফ নীরেনদা নিজে দেখেছিলেন। শুধু তাই নয়, যত্ন করে দেখে কোন শব্দ অভিধানে দরকার নেই, আর কোন শব্দ যোগ করার প্রয়োজন— সেগুলো তিনি আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ দিতেন। খানিকটা নেপথ্যে থেকে কাজ করলেও বাংলা ভাষা নিয়ে তার কাজ কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
আমিও বাংলা ভাষা এবং বানান নিয়ে কাজ করেছি। তবে নীরেনদার সঙ্গে কখনও মতের অমিল হয়নি। তিনি যখন আনন্দবাজারের জন্য বানান সংক্রান্ত বই সম্পাদনা করেছেন, আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বানান নিয়ে আমার যুক্তি মেনেও নিয়েছেন।
কবি হিসাবে নীরেনদাকে মনে রাখবে বাঙালি। কিন্তু, বাংলা ভাষা নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের তো বাঙালি তেমন করে চেনে না। বিশেষ খেয়ালও রাখে না তারা। তবে, নীরেনদা গোটা কাজটা এমন পর্যায়ে গিয়ে করেছেন, তাতে বাঙালি তাঁকে এই ক্ষেত্রেও মনে রাখবে।
নবনীতা দেব সেন বলেছেন…
দেশ পত্রিকার জন্য প্রথম বার যখন আমার লেখা নির্বাচিত হল, তখন আমার কাছে যে চিঠিটা এসেছিল, তাতে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর স্বাক্ষর। উনি চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে আমার লেখা দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। সে দিনের অনুভূতি তো আজও টাটকা। আমাকে ছোটদের জন্য লেখার উৎসাহ নীরেনদাই জুগিয়েছিলেন। এই বয়সে এসেও আমার লেখা কোথাও বেরোলেই নীরেনদা পড়তেন। পড়ে তাঁর মতামত জানাতেন, বলতেন ভাল লেগেছে, উৎসাহ দিতেন। যে প্রশ্রয় নীরেনদার কাছ থেকে সারা জীবন পেয়েছি, তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই।
বলেছেন নবনীতা দেব সেন।
আমার জীবনের একটা পর্বে খুব মন খারাপের মধ্যে পড়েছিলাম। অনেক দিন আগের কথা। পাশে বসে নীরেনদা বলেছিলেন, ‘সত্যেরে লও সহজে’। পুরো কবিতাটা শুনিয়েছিলেন সে দিন। এ ভাবেই ভাল সময়, খারাপ সময়, সব সময়েই নীরেনদা আগলে আগলে রাখতেন। সত্যিই সমকালীন কবি-সাহিত্যিকদের পারিবারিক অভিভাবকের মত আগলে রাখতেন নীরেন্দ্রনাথ।
প্রথম আনন্দমেলা কোথায় দেখেছিলাম, স্পষ্ট মনে আছে। স্কুলে, এক বছরের ছোট এক বন্ধুর কাছে। তখন আনন্দমেলায় ‘সোনালি দাঁড়ার কাঁকড়া’ প্রকাশিত হচ্ছে। যেটি আদতে ‘দ্য ক্র্যাব উইথ দ্য গোল্ডেন ক্লজ’-এর বঙ্গানুবাদ। আমার ইংরিজিটা আগেই পড়া ছিল। কাজেই আর পাঁচজন বাঙালি কিশোরের মতো আমার সঙ্গে আনন্দমেলার পরিচয় টিনটিনের হাত ধরে নয়। সে পাট আমি আগেই চুকিয়ে ফেলেছি। আমি মোহিত হয়েছিলাম পত্রিকাটি দেখে। এবং প্রথম দর্শনেই প্রেম। সেই যে আমাদের বাড়িতে আনন্দমেলা ঢুকল, আজও তার জয়যাত্রা শেষ হয়নি।
নীরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখক ইন্দ্রনীল সান্যাল….
আমি ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছি সেই আনন্দমেলা, যা প্রথম দিকে বছরে একটি করে প্রকাশিত হত। যাতে বেরিয়েছিল কাকাবাবু আর সন্তুর প্রথম অ্যাডভেঞ্চার, ‘ভয়ংকর সুন্দর’। সঙ্গে ছিল, যদি খুব ভুল না করি, বিমল দাশের অসাধারণ অলঙ্করণ। ক’জন আমার বয়সী ছেলের সেই সব বার্ষিক সংখ্যা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমি জানি না।
ওই বয়সে পত্রিকার ক্ষেত্রে সম্পাদকের কী ভূমিকা, সেটা একজন খুদে পাঠকের জানার কথা নয়। কিন্তু আমি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নাম জানতাম, তার কারণ, আমাদের বাড়িতে একদল বই ও পত্রিকা পাগল মানুষের আনাগোনা ছিল। তাঁদের মুখেই এই ঢ্যাঙা কবির নাম শুনেছিলাম।
বলেছেন লেখক ইন্দ্রনীল সান্যাল।
পরবর্তীকালে আনন্দমেলা আকারে অর্ধেক হয়ে গেল। সেই পত্রিকার ডামি কপিও দেখেছি, যেটি সবার দেখার জন্যে নয়। ছোট আনন্দমেলা দেখে বেজায় দুঃখ হয়েছিল, কিন্তু সেটা কেটে গেল পত্রিকার তৃতীয় পাতায়, সূচিপত্রের পাশে সম্পাদকের লেখা ছড়া এবং তার সঙ্গে বিমল দাশের ইলাস্ট্রেশন দেখে। এত দশক পার করেও সেই সব ছড়া দিব্যি মনে আছে।
“কী শীত কী শীত দাদা/ কী শীত কী শীত।/ দিবস যদি বা কাটে/ কাটে না নিশীথ।/ নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে কাঁথা কম্বলে/উঁকি মেরে দেখি যায়/ বছরটা চলে।”
নীরেনবাবু ছিলেন বলেই অনেক ‘বড়দের লেখক’ ছোটদের জন্যে কলম ধরেছিলেন। আনন্দমেলাতেই গোগ্রাসে গিলেছি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, সঙ্গে সুধীর মৈত্রর অলংকরণ। কিছুদিন আগে সিনেমাটি দেখতে গিয়ে ওই অলংকরণগুলিকে অ্যানিমেশানে রূপান্তরিত হতে দেখে খুব মজা লেগেছিল।
‘বড়দের লেখক’ ছোটদের জন্য…
আনন্দমেলাতেই পেয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু-সন্তু সিরিজ, শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ, বিমল করের কিকিরা সিরিজ, সমরেশ বসুর গোগোল, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের রুকু-সুকু। এবং পুজো সংখ্যায় সত্যজিত রায়ের প্রফেসর শঙ্কু। আমাদের শৈশবে হ্যারি পটার ছিল না, আনন্দমেলা ছিল। জে কে রাওলিং ছিলেন না, ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
ফিরে আসি টিনটিনের প্রসঙ্গে। আমি বাংলা আর ইংরিজি দুটি ভাষাতেই টিনটিন পড়েছি। দুটি ভাষার আলাদা মজা। ইংরিজিতে যে স্নোয়ি, বাংলাতে সে কুট্টুস। ইংরিজিতে যারা ‘thompson অ্যান্ড thomson’ বাংলায় তারা জনসন ও রনসন। ক্যাপ্টেন হ্যাডকের গালাগালি ‘বিলিয়ন্স অ্যান্ড বিলিয়ন্স অফ ব্লু ব্লিস্টারিং বারবিকিউড বার্নাকলস’ পড়ে যেমন হেসেছি, তেমনই বাংলায় ‘এক্টোপ্লাজম, হিপোপটেমাস’ পড়ে মজা পেয়েছি।
টিনটিনের আমি এমনই ফ্যান ছিলাম যে বন্ধুর কাছ থেকে অ্যার্জের ঠিকানা জোগাড় করে ওঁকে চিঠি লিখেছিলাম। এবং খুব আশ্চর্যের বিষয় হল যে উনি উত্তর দিয়েছিলেন। লাল-নীল বর্ডারওয়ালা সেই খাম, সেই চিঠি, সেই সাক্ষর করা ফোটোগ্রাফ আমার কাছে আজও রাখা আছে। যেমন রাখা আছে বাঁধাই করা পুরনো আনন্দমেলা আর পুজো সংখ্যা আনন্দমেলা।
আমার সেই মফস্বলি শৈশব আজকের এই ডিজিটাল দুনিয়ার দেরাজে তুলে রাখা মরচে পড়া তোরঙ্গের মত বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু কখনও কখনও এমন সময় আসে, যখন সেই তোরঙ্গ খুলতে হয়। তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে শৈলেন ঘোষের বাগডুম সিং, ক্যালকুলাসের পেন্ডুলাম দুলিয়ে ‘পশ্চিমে আরও পশ্চিমে’ স্বগতোক্তি, কুন্তকের ‘শব্দ নিয়ে খেলা’, ‘কী বলছে ক্লাস টেনের ফার্স্ট বয়’… আর তাঁদের সঙ্গে যিনি আলাপ করিয়েছিলেন, সেই ঢ্যাঙা মানুষটি।
লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেছেন…
এ বার আমরা কোথাও আটকালে আর কার কাছে যাব? আপাতগম্ভীর মানুষটার মধ্যে যে কী অদ্ভুত রসবোধ ছিল, তা তাঁর সঙ্গে আমরা যাঁরা ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশেছি, তাঁরা জানি। যখনই লেখা নিয়ে সমস্যায় পড়েছি বা কোনও গাইডেন্সের দরকার পড়েছে, চোখ বুজলে যে দু’একটা মুখ বার বার ভেসে উঠেছে, তার মধ্যে অন্যতম নীরেনদা।
বলেছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।
বড় বেশি প্রশ্রয়, যোগ্যতার চেয়েও বেশি আদর ও স্নেহ পেয়েছি তাঁর থেকে। আসলে তখন বাংলা সাহিত্যের যুগটাই অন্যরকম ছিল। বেশ কয়েক জন সম্পাদকের সঙ্গে কবি-লেখকদের এক অনাবিল হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল, যেখান থেকে শাসন করা যায়, বকুনি দেওয়া যায়, আবার আদরে বুকে টেনে নেওয়াও যায়। সম্প্রতি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের কথা ঘোষণা হওয়ার পরেও আমার জন্য তাঁকে আনন্দিত হতে শুনেছি।
সম্পাদকের ভূমিকায় তাঁর নিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ না করলে, এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটা লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৫৬-৫৭ সালে, প্রণবকুমারের একটি কবিতা নীরেন্দ্রনাথ কিভাবে আনন্দবাজার পুজো সংখ্যা থেকে বাদ দিয়েছিলেন। প্রণবকুমার সম্পর্কে নীরেন্দ্রনাথের পিসতুতো ভাই। ওঁরা এক বাড়িতেই থাকতেন। সেবার আনন্দবাজারের ভারপ্রাপ্ত মন্মথ সান্যালের কথায় প্রণবকুমার একটি কবিতা জমা দিয়েছিলেন। সেই দপ্তরে নীরেন্দ্রনাথ ছিলেন মন্মথ সান্যালের সহকারী। একদিন নীরেন্দ্রনাথ বলেন,
‘তোর কবিতাটা দেশ পত্রিকায় দিয়ে দিয়েছি। কারণ আনন্দবাজারে তোর থেকেও একটা ভাল কবিতা ডাকে এসেছিল, লেখক পরিমলকুমার ঘোষ। লেখাটি এত ভাল যে ওটাই মনোনীত করলাম।’ প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত দুঃখ পেলেও এই নিরপেক্ষতাকে প্রণবকুমার সম্মান করতেন। সেই সময় নিজে যেখানে সম্পাদনায় যুক্ত থাকতেন সেখানে নিজে কখনও লিখতেন না। এই নিরপেক্ষতা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রক্ষা করেছিলেন।
নীরেন্দ্রনাথ ছিলেন নিরপেক্ষ…
আনন্দ পাবলিশার্সের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে ওঁরা দুটি সুবর্ণ সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। একটি গল্পের, অন্যটি কবিতার। গল্পের সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন রমাপদ চৌধুরী এবং কবিতারটি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কবির সঙ্গে কথা বলে ওঁরা বাড়িতে প্রয়োজনীয় বই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উনি বাড়িতে ছিলেন না, ছিলেন ওঁর বড় মেয়ের বাড়িতে সল্টলেকে। এমন সময়ে বইগুলি বাড়িতে এসে পৌঁছায়। ওনাকে জানতে চাওয়া হল,
‘আনন্দ পাবলিশার্স বই পাঠিয়েছে। সেই বইগুলি কি পাঠিয়ে দেওয়া হবে?’ উনি বললেন, ‘না।’ উনি বাড়ি ফিরে এলেন এবং কবিতা নির্বাচন করতে শুরু করলেন। প্রথমেই বললেন,
‘রবীন্দ্রনাথের পাঁচটা কবিতা, জীবনানন্দের তিনটি এবং তারপর থেকে একেবারে এই সময় পর্যন্ত সকলের দুটি করে কবিতা থাকবে।’
প্রশ্ন উঠল ‘একেবারে এই সময় যারা লিখছে তাদেরও দুটো করে থাকবে, আপনাদেরও দুটো? আপনাদের দুটো থাকলে তাদের একটা হওয়া উচিত।’
উনি বলেছিলেন, ‘আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হলে আমার কবিতা কখনোই সংখ্যায় বেশি থাকতে পারে না।’ সেইভাবেই কবিতা বাছাই করা হয়েছিল এবং সেই সংকলন ইতিমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে। এমনই ছিল তাঁর সম্পাদনার নিরপেক্ষতা।
সম্পাদনার ক্ষেত্রে নীরেন্দ্রনাথ ছিলেন আদর্শ …
নিজে সম্পাদক ছিলেন বলেই সম্ভবত সম্পাদকদের অসুবিধার দিকটা ওনার চোখে পড়ত। বর্তমান শারদীয়া সংখ্যায় প্রতিবছর তিনি একটা করে রহস্য উপন্যাস লিখেছেন। এছাড়া বর্তমান পত্রিকার রবিবারের সাহিত্যের পাতায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন রহস্য উপন্যাস। এমন সতেরো থেকে আঠারোটি উপন্যাস তিনি বর্তমান গোষ্ঠীর অন্তর্গত পত্রপত্রিকায় লিখেছেন। তবে লেখা সময়ে জমা দেওয়া নিয়ে কখনও সম্পাদককে অসুবিধায় পড়তে হয়নি। তাগাদা দেওয়ার আগেই লেখার কিস্তি পৌঁছে যেত সম্পাদকের দপ্তরে।
জীবনের শেষের দিকে কয়েক বছর ঢাকার কালি ও কলম পত্রিকার কলকাতা সংস্করণের সম্পাদক হয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ। তাঁর ইচ্ছায় সম্পাদকমণ্ডলীতে একে-একে যোগ দিয়েছিলেন আনিসুজ্জামান, আবুল হাসনাত, লুভা প্রমুখ। তখনও নির্দিষ্ট দিনের আগেই নীরেন্দ্রনাথ তাঁর সম্পাদকীয়টা ঠিক সময়ে দপ্তরে পৌঁছে দিতেন।
বাংলা সাহিত্যে পত্রপত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে নীরেন্দ্রনাথ যে আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন, পরবর্তী কালে তাকে ছাপিয়ে যাওয়া, যে কোন সম্পাদকের পক্ষে অতীব দুষ্কর।
বিশিষ্ট
সুধীন্দ্রনাথ শুনছেন রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতা পড়ছেন

কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কখনও কম কখনও আদৌ লিখতেন না
কবিতার বইয়ের সংখ্যা ছয় আর গদ্যের বই মাত্র দুই। আজকের দিনে এই প্রচারসর্বস্ব জগতে অত্যন্ত বেমানান। এখনকার সময়ে ভাবতেই বুঝি কেমন লাগে, সত্যিই তো, এত কম লিখেছেন, এত কম, কি করে হতে পারে! চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে কবিতার জগতে এক নিবিড় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে তিনি আছেন – হয় কম লেখেন অথবা কখনও আদৌ লেখেন না।
উনিশশো চৌত্রিশ – সাঁইত্রিশ, উনিশশো বিয়াল্লিশ – চুয়াল্লিশ, উনিশশো ছেচল্লিশ – বাহান্ন আবার উনিশশো সাতান্ন – ষাট, এই সব সময় কালে তিনি একটিও কবিতা লেখেননি। সেকালের কলকাতায় কেউ কম লেখালেখি করলে, একটা বহুল প্রচলিত রসিকতা ছিল, ‘তুমি কি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত হতে চাও?’
আরও পড়ুন: শুধু কবি নয় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন একজন দক্ষ সম্পাদকও বটে
সিগনেট প্রেসের দিলীপকুমার গুপ্তকে লেখা চিঠিপত্র সাক্ষী, কবিতার বই ‘সংবর্তের’ প্রুফ দেখতে গিয়েও তিনি কবিতা সংশোধন করে এসেছিলেন। চিঠিতে লিখেছিলেন ‘পাণ্ডুলিপি আর এই প্রুফ দুটোই প্রামাণ্য… যদি সব শেষের পেজ প্রুফটা একবার পাঠান, এক দিনেই দেখে ফেরত দেব।’ এও লিখেছিলেন, ‘দুর্বোধ্য বলে আমার দুর্নাম থাকাতে সাধারণ প্রুফপাঠক আমার লেখার ভুল শোধরাতে অনেক সময় ইতস্তত করেন। অতএব যদি দরকার মনে করেন, তাহলে আমিই সারা বইয়ের সর্বশেষ প্রুফ প্রেসে গিয়েও দেখে দিতে পারি, যাতে কোথাও অর্থহানি না ঘটে।’ সারা জীবন ধরে নিজের লেখা কেটেছেন, ছেঁটেছেন, জুড়েছেন এবং পালটেছেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সুধীন্দ্রনাথকে অধ্যাপক নিযুক্ত করতে সমস্যা হয়েছিল
কাশীতে অ্যানি বেসান্তের থিওসফিক্যাল স্কুল থেকে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, তারপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ কোর্সে ভর্তি। তবে এম এ পড়া তার শেষ হয়নি। জিওফ্রে চসারের কবিতা নিয়ে ক্লাস চলছে। মাস্টারমশাই বললেন, চসারের কবিতা পাঠ করতে। সুধীন্দ্রনাথ প্রথম দিন পাঠ করলেন, দ্বিতীয় দিনও পাঠ করলেন, তৃতীয় দিনে বেঁকে বসলেন। কবিতা আবার উঁচু গলায় পড়া কেন? মাস্টারমশাই ছাত্রের নামে উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে অভিযোগ করলেন। উপাচার্যের নির্দেশে সুধীন্দ্রনাথ ক্ষমা চাইলেন বটে, তবে ক্লাসে তার আর মন টিঁকল না।
বুদ্ধদেব বসু অবশ্য তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকার সুধীন্দ্রনাথ স্মরণ সংখ্যায় লিখেছিলেন, মতান্তরের কারণ ছিল অন্য— শেক্সপিয়রকে নিয়ে ব্যখ্যা। পরবর্তী কালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ বিভাগে সুধীন্দ্রনাথকে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করতে গিয়ে, সুধীন্দ্রনাথের প্রথাগত ডিগ্রীর অভাবের কারণে বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ‘আংশিক সময়ের অধ্যাপক’ হিসেবে নিযুক্তি দিয়ে কোন রকমে সেই সমস্যা সামলানো হয়। অথচ সারা কলকাতা জানত, তুলনামূলক সাহিত্যে, মালার্মে-ভালেরি-রিলকে-এলিয়টের কবিতা পড়ানোয় সুধীন্দ্রনাথের চেয়ে যোগ্য শিক্ষক সেই সময় আর কেউ ছিলেন না।
ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যেও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রীতিমত দক্ষ ছিলেন
জীবনের প্রথম দিকে বাংলা চর্চার সুযোগ পাননি, শিখেছিলেন ইংরেজি ও সংস্কৃত। উনিশশো উনত্রিশ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জাপান ও আমেরিকা সফর করেন। পরে একা একা ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন। এই বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়েছিল তাঁর কাব্যের মধ্যে। ইউরোপ থেকে ফেরার পরে শুরু হয় সুধীন্দ্রনাথের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল পর্যায়। উনিশশো তিরিশ থেকে উনিশশো চল্লিশ, এই দশ বছর সময় কাল তাঁর অধিকাংশ প্রধান রচনার সৃষ্টি কাল। এই একটি মাত্র দশকের মধ্যে শেষ করেছিলেন ‘অর্কেস্ট্রা’, ‘ক্রন্দসী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘সংবর্ত’ প্রমুখ কাব্যগ্রন্থ ও গদ্য সংগ্রহ। তাঁর সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকার সবচেয়ে উজ্জ্বল পর্যায়, উনিশশো একত্রিশ থেকে ছত্রিশ, তাও এই সময় কালের মধ্যে।
সুধীন্দ্রনাথকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ‘তাঁর মতো বিরাট প্রস্তুতি নিয়ে আর কেউ বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে অগ্রসর হননি।’ এই বিরাট প্রস্তুতির মধ্যে যেমন ছিল বিপুল পড়াশোনা, সংস্কৃত ছন্দ শাস্ত্রের অগাধ জ্ঞান, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ভাষার সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপ, তেমনই ছিল কবিতা নিয়ে তাঁর নিরন্তর ভাবনাচিন্তা। এ ভাবনার সন্ধান রবীন্দ্রনাথও পেয়েছিলেন।
হিরণকুমার সান্যাল লিখেছেন, জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথ তরুণ লিখিয়েদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পড়ে শোনাবেন ‘শেষের কবিতা’। কবিতা পাঠ চলাকালীন হঠাৎ ঔপন্যাসিক-কবি নিবারণ চক্রবর্তীর কবিতার পাশাপাশি উঠে এল ইংরেজি কবিতার কিছু অংশ। রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ অপূর্বকুমার চন্দের কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই ইংরেজি কবিতা কার লেখা জানো?’ প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক অপূর্ব বললেন, ‘ঠাহর করতে পারছি না।’ অদূরেই চুপচাপ বসে ছিলেন এক তরুণ, উজ্জ্বল এক কৌতুক ছড়িয়ে তাঁর চোখে মুখে। তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি এই ইংরেজি কবিতা ও তার রচয়িতা সম্পর্কে দস্তুরমতো ওয়াকিবহাল। সেদিনের সেই তরুণ ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ।
বিশিষ্ট
প্রিয়নাথ ও রবির সম্পর্ক ছিল রসিক ও স্রষ্টার মত

‘জীবনস্মৃতির’ একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন
“এই সন্ধ্যাসংগীত রচনার দ্বারাই আমি এমন একজন বন্ধু পাইয়াছিলাম যাঁহার উৎসাহ অনুকূল আলোকের মতো আমার কাব্যরচনার বিকাশচেষ্টায় প্রাণসঞ্চার করিয়া দিয়াছিল। তিনি শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেন। তৎপূর্বে ভগ্নহৃদয় পড়িয়া তিনি আমার আশা ত্যাগ করিয়াছিলেন, সন্ধ্যাসংগীতে তাঁহার মন জিতিয়া লইলাম। তাঁহার সঙ্গে যাঁহাদের পরিচয় আছে তাঁহারা জানেন, সাহিত্যের সাত সমুদ্রের নাবিক তিনি। দেশী ও বিদেশী প্রায় সকল ভাষার সকল সাহিত্যের বড়ো রাস্তায় ও গলিতে তাঁহার সদা সর্বদা আনাগোনা। তাঁহার কাছে বসিলে ভাবরাজ্যের অনেক দূর দিগন্তের দৃশ্য একেবারে দেখিতে পাওয়া যায়। সেটা আমার পক্ষে ভারি কাজে লাগিয়াছিল।
সাহিত্য সম্বন্ধে পুরা সাহসের সঙ্গে তিনি আলোচনা করিতে পারিতেন— তাঁহার ভালো লাগা মন্দ লাগা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত রুচির কথা নহে। একদিকে বিশ্বসাহিত্যের রসভান্ডারে প্রবেশ ও অন্য দিকে নিজের শক্তির প্রতি নির্ভর ও বিশ্বাস— এই দুই বিষয়েই তাঁহার বন্ধুত্ব আমার যৌবনের আরম্ভকালেই যে কত উপকার করিয়াছে তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। তখনকার দিনে যত কবিতাই লিখিয়াছি সমস্তই তাঁহাকে শুনাইয়াছি এবং তাঁহার আনন্দের দ্বারাই আমার কবিতাগুলির অভিষেক হইয়াছে। এই সুযোগটি যদি না পাইতাম তবে সেই প্রথম বয়সের চাষ-আবাদে বর্ষা নামিত না এবং তাহার পরে কাব্যের ফসলে ফলন কতটা হইত তাহা বলা শক্ত।“
আরও পড়ুন: ‘চিনে মরণের ব্যবসায়’ শিরোনামে লিখলেন রবীন্দ্রনাথ
শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যরসিকের সঙ্গে এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যস্রষ্টার। ‘জীবনস্মৃতি’ থেকে জানা যায় ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রিয়নাথ সেনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। এর আগে ‘ভগ্নহৃদয়’ পড়ে প্রিয়নাথ, কবি সম্পর্কে হতাশ হয়েছিলেন।
প্রিয়নাথের লেখা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন
ফরাসি সাহিত্যের ভিক্টর হুগোর একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন প্রিয়নাথ এবং সম্ভবত রবীন্দ্রনাথও বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই সময় ‘ভারতী’ পত্রিকাতে রবীন্দ্রনাথ হুগোর কিছু লেখার অনুবাদ করেছিলেন। এমন কি ‘প্রভাতসঙ্গীত’-এর মধ্যেও হুগোর অনুবাদ স্থান পেয়েছিল যদিও পরবর্তীকালে তা বাদ দেওয়া হয়। আঠারশো বিরাশি খ্রীষ্টাব্দে পুজোর পরে রবীন্দ্রনাথ দার্জিলিং থেকে ফিরে আসলে সার্কুলার রোডের বাড়িতে সাহিত্যচর্চা হেতু ‘সমালোচনীসভা’ স্থাপিত হয়। প্রিয়নাথ সেখানে আসতেন। সম্ভবত এই সময় প্রিয়নাথ বন্ধুকে গোতিয়ের Mademoiselle De Maupin বইটি পড়তে দেন। তারপর প্রিয়নাথকে কবি পত্র দেন, ‘এবার ভারতীতে যে কবিতাটি যাবে সেইটে সঙ্গে আনবেন। মেজদাদার Mademoiselle De Maupin খুবই ভালো লাগচে – কাল এসে শুনবেন।’
ঘটনাপঞ্জী ধরলে বোঝা যায় প্রিয়নাথের সঙ্গে কবির পরিচয় গড়ে উঠেছিল আঠারশো আশি খ্রীষ্টাব্দ বা তারও আগে থেকে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন আঠারো-উনিশ, তখন থেকেই তাঁর সাথে প্রিয়নাথের পরিচয়। ইংরেজি সাহিত্য ছাড়াও ফরাসি জার্মান ও আমেরিকান সাহিত্যে প্রিয়নাথের প্রভূত দখল ছিল।
প্রিয়নাথের লেখা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “প্রিয়নাথ সেনের এই প্রবন্ধগুলিকে সেই দূরের থেকে আজ দেখছি। সেদিনকার অপেক্ষাকৃত নির্জন সাহিত্যসমাজে শুধু আমার নয়, সমস্ত দেশের কিশোরবয়স্ক মনের বিকাশস্মৃতি এই বইয়ের মধ্যে উপলবদ্ধ করছি।” প্রকৃতপক্ষে প্রিয়নাথ ছিলেন এক সমৃদ্ধ বইপোকা।
প্রিয়নাথকে নিয়ে প্রমথ চৌধুরী বলেছেন
প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় ‘তিনি যে একজন বড় লেখক হন নি – তার কারণ তিনি ছিলেন একজন বড় পাঠক।’ দুর্লভ স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের মধ্য দিয়ে উৎকৃষ্ট পাঠক প্রিয়নাথ পরোক্ষ ভাবে সৃষ্টির পিপাসা মিটিয়েছিলেন যা আজকের প্রেক্ষিতে অনুধাবন করা সতত কঠিন।
প্রিয়নাথ সম্পর্কে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “সংস্কৃত, বাঙ্গালা, পার্শী ফ্রেঞ্চ ও ইংরাজী ভাষায় ও সাহিত্যে তাঁহার অধিকার ছিল।” নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “When I first saw him Preonath could read French and Italian in the original and subsequently learned other European languages. Persian he learned last and I borrowed from him a splendid edition of Hafiz’s poem with an English translation.”
বিশিষ্ট
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাধু হবেন

বিশিষ্ট সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় জীবন দর্শন বড়ই অভিনব। রামকৃষ্ণ মিশনে থাকতে থাকতে সাধু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাবা জোর করে বাড়ি না ফিরিয়ে আনলে হয়ত সাধুই হয়ে যেতেন। বাংলা সাহিত্যের লাভ, ভাগ্যিস তিনি ফিরে এসেছিলেন। তাই তো আমরা পেলাম সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁর জীবন নিয়ে খানিক আলোচনা করা যাক!
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় জীবন দর্শন অধ্যাত্মপূর্ণ দেওঘরে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে ছিলেন
বিমল কর…গম্ভীর মানুষ…নিপাট শুভ্র পোশাক…মাথা নীচু করে লিখে চলেছেন। মুখের দিকে না তাকিয়েই বললেন, কি করেন? সাহস পেয়ে তরুণ লেখক অনর্গল, নিজের সম্বন্ধে বলতে শুরু করলেন। সব শুনে বিমলবাবু এবার মুখ তুলে তাকালেন আর বললেন, কাল আসুন। তরুণ লেখক উত্তেজনায় রাতে ঘুমোতে পারেন না। কেন? কেন? বিমল কর কেন বললেন দেখা করতে!
পরদিন তরুণ লেখক ছুটলেন বিমল করের অফিসে। সেই এক ছবি। কোন পার্থক্য নেই। তবে আজ বসতে বললেন, সাথে চা। তারপর বাড়িয়ে দিলেন এক টুকরো কাগজ। লেখা রয়েছে ‘জীবিকার সন্ধানঃ পশ্চিমবঙ্গ’। বললেন, এই বিষয় নিয়ে আপনি তো কাজ করেছেন! জীবিকার জন্য মানুষ কি করবে, সেই নিয়ে লিখতে হবে। পারবেন? তরুণ বললেন, পারব। তবে স্বনামে লিখতে পারব না। তরুণ লেখক সরকারি চাকরি করেন। অগত্যা ছদ্মনাম ব্যবহার করা ছাড়া উপায় কি! ‘সঞ্জয়’ নামে শুরু হল লেখা। সে লেখা প্রকাশিত হল এক বছর ধরে।
আরও পড়ুনঃ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কেন আনন্দাবাজার ছেড়েছিলেন?
তরুণ লেখকের এতে কি লাভ হল, সেটা পরের কথা। তবে তিনি বিমল করের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে পড়লেন। ধর্মতলা ট্রাম গুমটির সামনে কার্জন পার্কে রোজ সন্ধ্যায় আড্ডা বসত। চাঁদের হাট বসত সে আড্ডায়। তত দিনে বিমলদা, তরুণ লেখককে ‘আপনি’ ছেড়ে ‘তুই‘ বলা শুরু করেছেন। এবার এলো সেই সন্ধিক্ষণ। দেশ পত্রিকায় নিজ নামে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লিখলেন, গল্পের নাম ‘শ্বেতপাথরের টেবিল‘।‘ শ্বেতপাথরের টেবিল‘ প্রকাশের পরে, অভিনন্দন জানিয়ে অনেকে বলেছিলেন, পরশুরামের পরে বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসের ধারা ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছিল। আপনি এসে আবার সেই মজে আসা খালে জল ছাড়লেন।
বিমল কর জানতে চেয়েছিলেন, কি করেন? তার উত্তরে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় অনর্গল নিজের কথা বলতে শুরু করেছিলেন
রামকৃষ্ণ মিশনের পত্রিকা ‘উদ্বোধনের‘ সম্পাদক স্বামী শ্রদ্ধানন্দজী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দেওঘরে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে। সেখানে থাকতে থাকতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন সাধু হবেন। বেঁকে বসলেন বাবা। তা কি করে হয়? বাকি জীবন তিনি কি নিয়ে থাকবেন? কোন কথা নয়। পত্রপাঠ ছেলেকে ফিরতে বললেন কলকাতায়। শহরে ফিরে একটি চলচ্চিত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হল ছোট গল্প ‘পরিতোষের সিনেমা‘। তারপর কিছুদিন লেখাতে ইতি পড়েছিল।
চাকরি পেলেন শিল্প দপ্তরে। শুরু হল শিল্প সাংবাদিকতা। সরকারি পত্রিকা ‘স্মল ইন্ডাস্ট্রি নিউজে‘ একটি একটি করে বিভিন্ন জেলার শিল্পসম্পদ, জনসম্পদ নিয়ে লেখা, বিজ্ঞাপনের জন্য কপি রাইটিং, আর্ট ওয়ার্ক, ক্যাচ লাইন তৈরি ইত্যাদি সব সামলেছেন। ছিলেন শিল্পমন্ত্রী জয়নাল আবেদিনের ভারী পছন্দের মানুষ। তবে এত সবের পরেও শান্ত হত না মন। হবে কি করে? কাজগুলো সবই যে চাকরির তাগিদে। মনের খোরাক তাতে কোথায়? এর মধ্যে ঘটল একটি চমৎকার কাণ্ড। শিল্প দপ্তরে এক আধিকারিকের সান্নিধ্যে এসে মনে হল এক টুকরো মরূদ্যান পেয়েছেন। আধিকারিকের নাম অমলকান্তি ভট্টাচার্য।
‘যুগান্তর’ সাময়িকীতে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটি ফিচার প্রকাশিত হয় নাম ‘জেটযুগের ক্রন্দন’
অমলকান্তি কাজপাগল মানুষ। তার সাথে অবশ্য সমান তালে সাহিত্যরসিক এবং রবীন্দ্রভক্ত। প্রতি শনিবার তাঁর চেম্বারে সাহিত্যসভা বসত। এই সভায় মাঝে মধ্যে উপস্থিত হতেন ভবানী মুখোপাধ্যায়। বেহালার বাসিন্দা। তিনি কিছু দিন ‘অমৃত’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
এই সময় ‘যুগান্তর’ সাময়িকীতে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের একটি ফিচার প্রকাশিত হল। লেখার নাম ‘জেটযুগের ক্রন্দন’। একদিন শীতের সকালে, বাড়ির শ্বেতপাথরের টেবিলের ওপরে রবিবারের যুগান্তর পড়ে আছে আর তরুণ সঞ্জীব সংবাদপত্রটির দিকে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছেন। সংবাদপত্রের পাতায় ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে লেখক সেদিন আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন। আনন্দের আতিশয্যে বরানগরের কুঠিঘাট রোডের এ-মাথা থেকে ও-মাথা চরকি পাক খাচ্ছিলেন।
এরপর ‘অমৃত‘ সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরপর দুটি গল্প প্রকাশিত হল। তৃতীয় গল্প প্রকাশের পরে ভবানী মুখোপাধ্যায় বললেন, খুব ভাল লিখেছ। এবার দেশ পত্রিকায় লিখবে। বিমল করের কাছে যাও। আমি বলে দিচ্ছি। বিমল কর তখন ‘দেশ‘ পত্রিকায় গল্প বিভাগ দেখতেন। সেই শুরু। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কলম এখনও চলছে।