Connect with us

শিল্প

থার্ড থিয়েটার বাদল সরকার বলেছিলেন বেঁচে থাকা অধিক শ্রেয়

Published

on

থার্ড থিয়েটার বাদল সরকার

নবনীতা দেবসেনের মৃত্যুর পর জনপ্রিয় একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাতকারে সবিতেন্দ্রনাথ রায় (মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স) ওরফে ভানুবাবু স্মৃতিচারণে বলেছেন, বাদলবাবুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই বয়সে আবার আপনি নতুন করে পড়াশোনা আরম্ভ করলেন…তাতে বাদলবাবু আমাকে বলেন যে, আসলে এই তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়টা সম্পর্কে আমার খুব জানার ইচ্ছে, তাই নবনীতাদির কাছে শিখব বলেই ভর্তি হয়েছি। থার্ড থিয়েটার বাদল সরকার সম্বন্ধে আলোচনা এভাবেও শুরু করা যেতে পারে।

থার্ড থিয়েটার বাদল সরকার ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটারের একটি স্পর্ধা

মৃত্যুর চেয়ে বেঁচে থাকা অধিক শ্রেয়বলেছিলেন যে বাদল সরকার, তিনি ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটারের একটি স্পর্ধা। মঞ্চ না হলেও যে থিয়েটার সম্ভব, তা দেখিয়েছিলেন বাদল সরকার। লাতিন আমেরিকার তৃতীয় চলচ্চিত্র-এর আদলে থার্ড থিয়েটার বাতৃতীয় থিয়েটার নামে একটি নতুন থিয়েটার আন্দোলন প্রবর্তন করেছিলেন। থিয়েটারের ভাষাকে নিজের মত করে ভেঙে গড়ে একটা নতুন ভাষার রূপ দিয়েছিলেন। সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিকতা, সব কিছুর কাছে ছিলেন দায়বদ্ধ। নিজের ভাবনার সাথে কখনও আপোষ করেননি। মূলত যাত্রা এবং দেশীয় ঐতিহ্যের নির্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছিল তৃতীয় থিয়েটার।

আরও পড়ুনঃ ঐতিহ্যের স্টার থিয়েটার বেঁচে আছে ইতিহাস হয়ে বিক্রি হয়েছে বারবার

নাটকের মধ্যে কোন সুনির্দিষ্ট চরিত্রায়ন নেই। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ইচ্ছেমত চরিত্র নির্বাচন করতে পারেননাটকের মাঝখানে চরিত্র বদল করতে পারেন। এমন কি চাইলে, দর্শকরাও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই ছিল মোটামুটি তৃতীয় থিয়েটারের বৈশিষ্ট্য। যে কোন সময় মনে হতে পারে, নাটকের সব চরিত্র যেন শূন্য থেকে আগত। তারপর শুরু হয় তাদের পথচলা। ধীরে ধীরে চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তারপর শুরু হয় তাদের অন্তর্লীন হয়ে যাওয়া। এই ভাবে নাটকটি সার্বিক ইতিবাচক রূপ নেয়।

বাদল সরকার মানে সত্তরের টালমাটাল সময়ে থিয়েটারকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাতিয়ার রূপে ব্যবহার

সত্তর দশকের টালমাটাল বাংলায় নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাতিয়ার স্বরূপ সাধারণ মানুষের মধ্যে বাদল সরকারের নাটকের এই নতুর ফর্ম দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিলনাটকের দল শতাব্দী প্রতিষ্ঠা করেন উনিশশো ছিয়াত্তর সালে। ভারতীয় নাট্যজগতে স্বকীয়তার গুণে আধুনিক নাট্যকার বলে যারা বিশেষ রূপে পরিচিত,  যেমন হাবিব তনভীর, বিজয় তেণ্ডুলকার, গিরিশ কারনাড, তাঁদের সাথে এক ডাকে উচ্চারিত হয় বাংলার এই ছকভাঙা নাট্যকারের নাম।

পেশায় ছিলেন টাউন প্ল্যানার। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে এঞ্জিনীয়ারিং পাশ করেছিলেন শিবপুর থেকে। সহপাঠী ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল। সাহিত্য ও নাটকের প্রতি অপরিসীম উৎসাহের কারণে বৃদ্ধ বয়সে, তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে ভর্তি হয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী। ভারত সরকারের থেকে ১৯৯৭ সালে পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি সংস্থার সর্ব্বোচ্চ পুরস্কার রত্ন সদস্য  

Continue Reading

শিল্প

ঐতিহ্যের স্টার থিয়েটার ইতিহাস হয়ে বেঁচে বিক্রি হয়েছে বারবার

Published

on

ঐতিহ্যের স্টার থিয়েটার ইতিহাস

শহর কলকাতার বুকে ঐতিহ্যের স্টার থিয়েটার ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে। তাকে নিয়ে কত গল্প, কত কাহিনা। হোরমিলার কোম্পানির গণেশদাস মু্সুদ্দির ছেলে ছিলেন গুর্মুখ রায় যে কোন মূল্যে বিনোদিনীকে পেতে তিনি নতুন থিয়েটার খুলতে ছিলেন বদ্ধপরিকরশেষে আটষট্টি বিডন স্ট্রিটে জমি ইজারা নিয়ে থিয়েটার খোলা হল। তবে থিয়েটারের নাম বিনোদিনীর নামে হল না। থিয়েটারের নাম রাখা হল স্টার গিরিশ ঘোষের নাটক দক্ষযজ্ঞ দিয়ে উদ্বোধন হল থিয়েটার কয়েক বছর পরে, থিয়েটার ছাড়তে বাধ্য হলেন গুর্মুখঅমৃতলাল মিত্র, হরিপ্রসাদ বসু এবং দাসুচরণ নিয়োগীকে সঙ্গে নিয়ে, অমৃতলাল বসু মাত্র এগারো হাজার টাকার বিনিময়ে স্টারের নতুন মালিক হলেন 

ঐতিহ্যের স্টার থিয়েটার ইতিহাস হয়ে বেঁচে নটী বিনোদিনীর জন্য তৈরি হয়েছিল অথচ নটীর নামে নামকরণ হয়নি কি আশ্চর্য

ওদিকে ‘বেল্লিকবাজার নাটকে রঙ্গিণীর ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে অভিনয় জগত থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন বিনোদিনীপরিস্থিতি এমন হল যে স্টার থিয়েটার এবার উঠে যাওয়ার উপক্রমমালিক পক্ষ তিরিশ হাজার টাকায় স্টার থিয়েটার বিক্রি করলেন গোপাললাল শীলকে। স্টারের  নতুন নাম হল এমারেল্ড থিয়েটার  তৈরি হল নাটকের নতুন দল। তবে এতসব করেও এমারেল্ড ওরফে স্টারকে টিকিয়ে রাখা গেল না। এমারেল্ড উঠে যাওয়ার পর অমরেন্দ্রনাথ দত্ত সেখানে চালু করলেন ক্লাসিক থিয়েটারপ্রথম দু’-একটা শো হওয়ার পরেদত্তবাবুর কপালে আবার ভাঁজ পড়ল। দর্শককে যে কোন মতেই থিয়েটারমুখী করা যাচ্ছিল না।   

আরও পড়ুনঃ movies banned in India বা নিষিদ্ধ সিনেমা কাকে বলে?

দর্শক টানতে স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল ক্ষীরোদপ্রসাদের বিদ্যাবিনোদের আলিবাবা

এরই মধ্যে খড়দহের শিরোমণি বংশের গুরুচরন ভট্টাচার্যের ছেলে, জেনারেল অক্টারলি কলেজের রসায়নের অধ্যাপক, রিচার্ড বার্টনের অনুবাদকে ভিত্তি করে একটি নাটক লিখে ফেলেছেন। নাটকের নাম আলিবাবা প্রচুর গানে জমজমাট সে এমন এক রঙ্গনাট্য, কলকাতার দর্শক যা আগে কোন দিন দেখেনি। নতুন নাট্যকারের নতুন নাটক প্রযোজনার ঝুঁকি নিতে অমৃতলাল রাজি হলেন না আলিবাবার নাট্যকার দিনের বেলায় কলেজে রসায়নের জটিল তত্ত্ব পড়াচ্ছেন, অন্য সময় নাটক নিয়ে মেতে আছেন। কলেজে যিনি অধ্যাপক ক্ষীরোদপ্রসাদ ভট্টাচার্য, রঙ্গমঞ্চে তিনিই নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ।

অমৃতলাল যে আলিবাবা নাটক বাতিল করেছেন, সে কথা অমরেন্দ্রনাথের কানে পৌঁছেছিল। বাতিল  নাট্যকারের সঙ্গে এবার যোগাযোগ করলেন নতুন নাট্যপ্রযোজক সিদ্ধান্ত হল আলিবাবা মঞ্চস্থ হবে। বিভিন্ন চরিত্রের জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীও বাছাই হয়ে গেল। ঠিক হল হুসেনের চরিত্রে অভিনয় করবেন অমরেন্দ্রনাথ নিজে, আলিবাবা ও কাশিমের চরিত্রে যথাক্রমে পূর্ণচন্দ্র ঘোষ এবং হরিভূষণ ভট্টাচার্য। মুস্তাফা ও আবদাল্লার চরিত্রে অভিনয় করবেন অজয়কুমার চক্রবর্তী ও নৃপেন্দ্রচন্দ্র বসু। অতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য হলেন দস্যু-সর্দার, মর্জিনার চরিত্রে কুসুমকুমারী আর ফতেমা আর সাকিনার চরিত্রে যথাক্রমে রাণীসুন্দরী ও ভূষণকুমারী। 

আলিবাবা নাটক থেকেই ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ নাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন

বিশে নভেম্বর আঠারশো সাতানব্বই কলকাতা তথা বাংলার রঙ্গমঞ্চে রচিত হল এক বিপ্লব যাকে বিস্ফোরণ বললেও অত্যুক্তি হয় নাবাংলা নাটকের ইতিহাসে এক যুগান্তের অবসান ঘটিয়ে বাংলা রঙ্গালয়ের নতুন জন্ম হল। সেদিন তার সাক্ষী ছিলেন মাত্র কয়েকজন। ভিড় জমতে দেরি হয়নি। ‘আলিবাবা’ মঞ্চস্থ করে অমরেন্দ্রনাথ দত্ত সে যুগে লক্ষাধিক টাকা লাভ করেছিলেন। 

সম্মান পেলেন অমরেন্দ্রনাথ আর ক্ষীরোদপ্রসাদ পেলেন নাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা। একসময় যে স্টার ক্ষীরোদপ্রসাদকে বাতিলের দলে ফেলে দিয়েছিল পরবর্তী কালে সেই স্টারেই ক্ষীরোদপ্রসাদের অনেক নাটক মঞ্চস্থ হয় যেমন জুলিয়া, দক্ষিণা, সপ্তম প্রতীক্ষা, সাবিত্রী, বঙ্গের প্রতাপাদিত্য, বৃন্দাবন বিলাস। নাট্যকাররূপে তিনি জনপ্রিয়তা পেলেও ব্যক্তিজীবনে তৈরি হয়েছিল ঘোর সঙ্কট। কলেজের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড জন মরিসন বললেন হয় নাটক ছাড় নয়তো কলেজ ছাড়। ক্ষীরোদপ্রসাদ শেষে কলেজ ছাড়াই মনস্থ করেছিলেনবাংলা রঙ্গমঞ্চের এই অসামান্য প্রতিভাকে বাঙালি প্রায় ভুলতে বসেছিল। নাট্যকারের জন্মসার্ধশতবর্ষে, তাঁর জন্মস্থান খড়দহে এবং কলকাতায় সুদীর্ঘ কাল পরে মর্মরমূর্তি স্থাপন করে, দেরিতে হলেও কলকাতা তাঁকে মনে রাখতে উদ্যোগী হয়েছে।

Continue Reading

শিল্প

পি সি সরকার ধর্মতলার মুখে নেতাজি বললেন, জাপান যাও

Published

on

কলেজ স্ট্রীটে একদিন এক প্রকাশনা সংস্থায় আড্ডা চলছে। পি সি সরকার সেখানে হাজির হলেন। ব্যায়ামবিদ বিষ্ণুচরণ ঘোষের আত্মীয় বুদ্ধ বসু হিমালয়ের ছবি তুলে এনেছেন।  সবাইকে তা দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। প্রকাশক মহাশয় পি সি সরকারকে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। এরপর সেখানে এসে দাঁড়ালেন আশুতোষ কলেজের অধ্যাপক বিজনবিহারী ভট্টাচার্য। 

পি সি সরকার ভারতীয় জাদুকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন

প্রকাশক মহাশয়, বিজনবাবুকে বাংলার অধ্যাপক বলে পরিচয় করিয়ে দিতে, নবাগত ব্যক্তি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আমি শুনেছি আপনি অর্থনীতির অধ্যাপক। বিজনবাবু বললেন,  ‘আমি অর্থের ধারে-কাছেও হাঁটি না। উত্তরে তিনি বললেন,কে বললে? এই তো আপনার চাদরে টাকা। ডান হাতে তুলে দেখালেন এক টাকা। তারপর বাঁ হাতেও তুলে নিয়ে দেখালেন আর একটি টাকা। সবাই হতভম্ব। এভাবে মানুষের গা থেকে টাকা বেরোয় কি করেভুল ভাঙল কিছুক্ষণ পরে। সবাই বুঝল, এ নিশ্চয় ম্যাজিক। তবে এত অল্প সময়ে এমন ঠাসাঠাসির মধ্যে কি করে তিনি এমন চমৎকার ম্যাজিক করে দেখালেন, সেটা  আড্ডার কেউ ভেবে কুলকিনারা করতে পারল না।

বিজনবাবুকে দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর আড্ডায় সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে জনৈক জাদুকর দেখাতে শুরু করলেন একটার পর একটা অসাধারণ ম্যাজিক। স্বচক্ষে না দেখলে সেসব বিশ্বাস করা যায় না। শুধু যাদু কেন, সেই মানুষটির অমায়িক ব্যবহারও সেদিন আড্ডার সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। 

জাদুকর প্রতুল চন্দ্র সরকার নেতাজিকে ‘সুভাষদা’ নামে ডাকতেন

প্রকাশক মহাশয় জানতে চাইলেন, ‘তা সরকার সাহেব, নতুন খবর কি? কলকাতায় কবে শো হচ্ছে? উত্তরে সরকার মশাই জানালেন, ‘সে কথা বলতেই তো ছুটে আসা। ছায়া সিনেমা হলে নতুন শো-এর ব্যবস্থা হচ্ছে। আরও বললেন, ‘আমাকে বেশ কয়েকজনের একটা লিস্ট দেবেন। কমপ্লিমেন্টারি টিকিট পাঠাব। আশু আর নীহারকেও আসতে বলব। জানেন, আশু, আপনাদের আর্টিস্ট আশু বন্দ্যোপাধ্যায় আর নীহার মানে নীহাররঞ্জন গুপ্ত আর আমি, এই তিন বাঙাল অবসর পেলেই এক সাথে ঘুরতে বেরোই। পকেট তো ভাঁড়ে মা ভবানী! পথঘাট দেখেই সময় কাটে। আজ তো ভগবানের দয়ায় তিনজনই কিছু করে খাচ্ছি। আড্ডায় এবার প্রবেশ করলেন বিভূতিভূষণ। সরকার মশাই তাঁকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠলেন,  আপনাকেও যেতে হবে আমার ম্যাজিক দেখতে।

উনিশশো পঁয়তাল্লিশের আঠারো আগস্ট নেতাজির কি হয়েছিল

এই মানুষটি ছিলেন জাদুকর প্রতুল চন্দ্র সরকার, পি সি সরকার নামে যিনি দর্শকদের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন। নেতাজিকে সরকার মশাই সুভাষদা নামে ডাকতেন। তাঁর সঙ্গে নেতাজীর পরিচয় স্বরস্বতী প্রেসে। সেকালে স্বরস্বতী প্রেসে শহরের বহু বিশিষ্ট মানুষ মিলিত হতেন। অগণিত বাঙালি যুবকের মত প্রতুল চন্দ্র সরকারও নেতাজির ভাবমুর্তির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। নেতাজির জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ চালাতে, যাদু প্রদর্শনীর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতেন। নেতাজির অনেক নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তিনি বাহকের কাজ করেছেন।

পি সি সরকার

জাপান যেতে তাঁকে স্বয়ং নেতাজি উৎসাহিত করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষিতে এক বাঙালি শিক্ষিত যুবক, সরকারি অফিসে করণিক না হয়ে যে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটি বিষয়কে জীবিকা করতে চাইছেন, সেটা নেতাজির কাছে সরকার মশাইকে খুব প্রিয় করে তুলেছিল। সরস্বতী প্রেসে এসে সময় পেলে, তাঁর সঙ্গে নেতাজীর কথা হত। নেতাজি বলেছিলেন, ‘প্রতুল! ইংরেজরা কোন ভারতীয়কে যোগ্য সম্মান দেয় না। তার বদলে তুমি জাপান যাও। জাপানিরা প্রতিভাকে সম্মান দিতে জানে।

নেতাজির নির্দেশে পি সি সরকার জাপান যেতে উৎসাহিত হয়েছিলেন

জাপান সফর সহজ কাজ নয়। বিদেশে প্রদর্শনী করতে দরকার প্রচুর অর্থ এবং প্রস্তুতি। তাছাড়া স্থানীয় প্রশানের সহযোগিতাও দরকার। জাপান যাওয়ার চিন্তা ক্রমশ পি সি সরকারকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। একদিন তুমুল চিন্তামগ্ন হয়ে ভবানীপুর থেকে হেদুয়ার দিকে সরকার মশাই রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, হঠাৎ ধর্মতলার মুখে একটা কাল অস্টিন গাড়ি এসে তাঁর পথ আটকাল। গাড়ির ভিতর থেকে জলদগম্ভীর স্বরে ভেসে এলো নির্দেশ, ‘উঠে এসো। গলা চিনতে ভুল হয়নি। প্রতুলকে তুলে নিয়ে গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। তারপর এলো সেই চূ়ড়ান্ত নির্দেশ,  রাসবিহারী ডেকেছে। তুমি নিশ্চয় যাবে! ওখানে কয়েকটা প্রদর্শনী করবে আর ওর জন্য কিছু তহবিল সংগ্রহ করে দেবে।বাস্তবে সে সময় জাপানে বসে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য, রাসবিহারী বোস, অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন।

অর্থের অভাবে, জাহাজে ডেক-এর টিকিট কাটতে হয়েছিল। সম্পূর্ণ সাগর যাত্রায়  মাথার ওপর খোলা আকাশকে সঙ্গী করে পি সি সরকার, কোবে শহরে পৌঁছে, আবিষ্কার করলেন দরকারি কাগজ সর্বোপরি তাঁর জাদুবাক্স, সব উধাও হয়েছে। বহু সাধ্যসাধনার পর যাও বা ভিসা মিলল, তাও কিনা পর্যটনের জন্য। অদম্য প্রতুল, জাপানে বসবাসকারী কিছু ভারতীয়দের সাহায্যে অবশেষে সে দেশে জাদু দেখানোর সুযোগ পেয়েছিলেন।

পি সি সরকারকে নেতাজি পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, ‘এই আত্মসম্মান জিইয়ে রাখ। একদিন তুমি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসবে।’

তবে তাঁর সব থেকে বড় সমস্যার জায়গা তৈরি হয়েছিল প্রয়োজনীয় আয়োজন এবং যথেষ্ট সংখ্যক সহযোগীর অভাব। প্রায় খালি হাতে অজানা অচেনা দেশে জাদু দেখানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। এই কারণে, সরস্বতী প্রেসেও প্রতুল যাদু দেখাতে রাজি হতেন না। এমন কি তাঁর প্রিয় সুভাষদাবললেও নয়। একবার সুভাষদা-র কথায় তাঁর খুব রাগ হয়েছিল। নেতাজির রুমাল প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে সেবার প্রতুল তাঁর জাদু দেখাতে শুরু করেছিলেন। শেষে নেতাজি পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, এই আত্মসম্মান জিইয়ে রাখ। একদিন তুমি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসবে।

সেদিন জাপানে, এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। সামান্য কিছুক্ষণের জাদুতে তিনি আসর মাতিয়ে দিয়েছিলেন। প্রদর্শনীর শেষে, জাপানি জাদুকরদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয় প্রতুলের। নিজেরা টাকা তুলে জাপানিরা, প্রতুলের প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ভিসার শর্ত শিথিল করতেও তারা সাহায্য করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, বিশে জুন উনিশশো সাঁইত্রিশ তারিখটা প্রতুল চন্দ্র সরকারের জীবনে বিপ্লব এনে দিয়েছিল। সেদিন থেকে সারা বিশ্ব তাঁকে পি সি সরকার নামে চিনতে শুরু করে।

Continue Reading

শিল্প

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন গহনা বড়ি শুধু দেখার জন্য

Published

on

 

অবন ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ সবাই ছিলেন গহনা বড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ

সাল উনিশশো তিরিশ। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত তমলুক মহকুমা। সেখানে মহিষাদলের লক্ষ্যা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন উপেন্দ্রনাথ মাইতি। তাঁর দুই নাতনি সেবা ও পুষ্প এবং নাতি আশিসকে শান্তিনিকেতন পাঠানো হয়েছিল পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। উপেন্দ্রনাথের কাকা স্বদেশনারায়ণ ছিলেন বেশ শিল্পরসিক। স্বদেশনারায়ণের উদ্যোগে, মা শরৎকুমারী দেবী এবং বউদি হিরণ্ময়ী দেবীর হাতে তৈরি বেশ কিছু নকশা বড়ি, সেবা মাইতির হাতে পাঠানো হয় শান্তিনিকেতনে গুরুদেবের কাছে। মেদিনীপুরের নকশা বড়ির অপূর্ব শিল্প সুষমা গুরুদেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

নকশা বড়ির শিল্পকৃতি বহুলাংশে গহনা বা অলংকার সদৃশ। অতি উত্তম এক চারুকলার নিদর্শন বলা চলে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গহনা বড়িকে শিল্প বলে মনে করতেন। তাকে রান্না করে খাওয়াকে শিল্পকর্ম ধ্বংসের সমতুল্য মনে করতেন। একবার রবিঠাকুরও বলেছিলেন, ‘গহনা বড়ি শুধুমাত্র দেখার জন্য, খাওয়ার জন্য নয়।’ তিনি গহনা বড়ির শিল্পকর্মের সাথে মধ্য এশিয়ার খোটানে আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্বের শিল্পকর্মের সাদৃশ্য খুঁজে পান এবং গহনা বড়ির প্রদর্শনীর যথাযথ ব্যবস্থা করেন। 

গহনা বড়ি মেদিনীপুর জেলার একটি অতি জনপ্রিয় শিল্প 

আদি থেকে আধুনিক, বিভিন্ন পর্বের বাংলা সাহিত্যেও গহনা বড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও স্থানীয় লোকাচার, গাথা ও ছড়াতেও এ বড়ির উল্লেখ পাওয়া যায় – ‘খুকুমণি কেন ভারি/পাতে নেই যে গয়না বড়ি’। বাঙলার বৈষ্ণবদের কাছে বড়ি সহজলভ্য এবং বিকল্প প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য বলে বহু দিন ধরে সমাদৃত। শোনা যায়, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এ বড়ির বিশেষ গুণমুগ্ধ ছিলেন। 

পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক, মহিষাদল, কাঁথি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমায় বহু বনেদি পরিবারে, বাড়ির মেয়েরা গহনা বড়ি তৈরি করে।ভারতে ইংরেজদের আবির্ভাবের পূর্বে গহনা বড়ি তৈরিতে পোস্তর প্রচলন ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের পরে, ব্রিটিশরা বেআইনি আফিমের এক বিশাল বাজার আবিষ্কার করে চিনে। ব্রিটিশরা তারই সূত্র ধরে বাংলার রাঢ় অঞ্চলের চাষীদের পোস্ত চাষ করতে বাধ্য করা হয়। তার থেকে বিপুল পরিমাণ আফিম বার করে নিয়ে, পাঠানো হত চিনে। আফিম নিষ্কাশনের পর পোস্ত বীজের আর কোন কাজ থাকত না। এই ফেলে দেওয়া পোস্তর বীজ ক্রমে বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার রান্নার একটি বিশেষ উপাদানে পরিণত হয়ে ওঠে। বিশেষত মেদিনীপুরে এই বীজ বা দানা গহনা বড়িতে ব্যবহার শুরু হয়।

গহনা বড়ির জিআই মার্কের স্বীকৃতি পাওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা 

নন্দলাল বসু গহনা বড়িকে বাংলা মায়ের গহনার বাক্সের একটি রত্ন বলে বর্ণনা করেছিলেন। গহনা বড়ি নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশেরও ইচ্ছে ছিল তাঁর। উনিশশো চুয়ান্ন সালে কল্যাণীতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের উনষাটতম অধিবেশনে গহনা বড়ি প্রদর্শিত হয়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগ আয়োজিত খাদ্য উৎসবে মেদিনীপুরের গহনা বড়ি প্রস্তুতকারী মহিলারা যোগ দিয়েছিলেন। কলকাতা ময়দানে হাজার হাজার কৌতুহলী নরনারীর সামনে হাতেকলমে গহনা বড়ি প্রস্তুত করে দেখানো হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গহনা বড়ি  নিয়ে প্রতিবেদন লেখা হয় এবং আকাশবাণী ও দূরদর্শনে এই শিল্প নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল। উনিশশো পঁচানব্বই সালে তমলুক শহরে গহনা বড়ি বিপণনের জন্য একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পূর্ব মেদিনীপুরের বেশ কিছু গ্রামে এই বড়ির বিক্রয় ভিত্তিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

রসগোল্লা বা জয়নগরের মোয়ার জিআই তকমা যেমন শুধু বাংলার হাতে, আশা করা যায় আইআইটি খড়গপুরের হাত ধরে  গহনা বড়ির ক্ষেত্রেও বাংলা সেই স্বীকৃতি পাবে। বিউলির ডাল শিল-নোড়া বা মিক্সিতে বেটে তার সঙ্গে বিভিন্ন মশলা মিশ্রণ করে, পোস্ত, তিল বা সুজির উপর জিলিপির মত করে গহনা বড়ি দেওয়া হয় বিভিন্ন নকশার আদলে। শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেদিনীপুর জেলার ঘরে ঘরে তৈরি হয় এই বড়ি। বাংলার মা, ঠাকুমারা দশকের পর দশক ধরে এ বড়ি তৈরি করে আসছেন। সম্প্রতি খড়গপুর আইআইটির একটি বিশেষ দল গহনা বড়ির নমুনা সংগ্রহ করেছে। জেলা শিল্প দপ্তরও বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হয়েছে যাতে গহনা বড়ি দ্রুত জিআই রেজিস্ট্রেশন পায়। 

Continue Reading